
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ২নং নন্নী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, স্থানীয়ভাবে যিনি ‘রিটন চেয়ারম্যান’ নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরে জনসেবা, সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা রিটন চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক পথচলা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, মানবিক উদ্যোগ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সক্রিয় থাকার বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত।
রিটন চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক শেকড় প্রোথিত একটি সুপরিচিত বিএনপি পরিবারে। তার আপন জেঠা মরহুম আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান ১৯৭৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পিতা মরহুম আলহাজ্ব হাফিজুর রহমান ১৯৭৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নন্নী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং শেরপুর জেলা বিএনপির সদস্য ছিলেন।
পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বড় ভাই মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আব্দুল্লাহ নালিতাবাড়ী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক এবং নন্নী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। অপর বড় ভাই এ.কে.এম. মুখলেছুর রহমান রিপন দুইবারের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান ও ২০১৪ সালে নালিতাবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি শেরপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া বড় বোন জেসমিন আক্তার ঝিনাইগাতী উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি, ফরিদা নাজনিন শ্রীবরদী উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি এবং সাবিনা ইয়াসমিন বিউটি জামালপুর জেলা মহিলা দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৬ সালের ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চশমা প্রতীক নিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রিটন চেয়ারম্যান। একই বছরের ৪ মে দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউনিয়নের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেন।
তার উদ্যোগে নন্নী বাজারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। বাজার এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, গলিপথ সংস্কার, কাঁচাবাজার ও মাছবাজারের অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। স্থানীয়দের মতে, এসব উদ্যোগের ফলে বাজার এলাকায় শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায় এবং মাদক, চুরি ও বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি “আলোকিত নন্নী” নামে একটি আধুনিক সড়কবাতি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। ইউনিয়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়কবাতি স্থাপনের মাধ্যমে রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নন্নী ইউনিয়নের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায়। প্রকল্পটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
মানবিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন রিটন চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। ২০২২ সালে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুর এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ২০২৪ সালে ফেনীর ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝেও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেন।
ধর্মীয় ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ হিসেবে ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নামে একটি দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা নির্মাণ করেন। তার মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে নির্মিত এই ফোয়ারা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুরূপ উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগায়।
রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির কেন্দ্রীয় মতবিনিময় সভা। রিটন চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার গুলশানে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
তার দাবি, আলোচনা পর্বে তারেক রহমান বলেন, “আমি রিটন চেয়ারম্যানের মুখ থেকে দুটি কথা শুনতে চাই।” পরে তিনি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান এবং স্কাইপি (Skype) মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি পারিবারিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং নিজের বিষয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি তার বড় ভাই একেএম মুখলেছুর রহমান রিপন সম্পর্কেও আলোচনা করেন। রিটন চেয়ারম্যান এ ঘটনাকে তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর ভারতের শিলংয়ে অবস্থানকালে সানরাইজ গেস্ট হাউসে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
রিটন চেয়ারম্যানের দাবি, রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর নির্দেশে কতিপয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি তার বাড়িতে গিয়ে মনোনয়নপত্র নিয়ে যায়। এর ফলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে ইউনিয়নে কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হন বলে তিনি দাবি করেন। রিটন বলেন, “বিষয়টি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহোদয় অবগত রয়েছেন এবং তিনি ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।”
রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি রাজনৈতিক মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন। বিশেষ করে একটি বিস্ফোরক মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি জনসেবা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন।
রিটন চেয়ারম্যানের দাবি, ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। করোনাকালীন সময়ে বিশেষ অবদান এবং স্থানীয় সরকার ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ সম্মাননা লাভ করেন।
তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালেও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।
শেরপুর জেলা বিএনপির কার্যালয় তার পরিবারের দানকৃত সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে বিএনপির রাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে।
রিটন চেয়ারম্যান বলেন, “রাজনীতি আমার কাছে ক্ষমতার নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার একটি মাধ্যম। জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা নিয়েই আমি আগামীতেও মানুষের পাশে থাকতে চাই ইনশাআল্লাহ।”
