
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বন্ধধারা গ্রামে ৫০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। জমিটি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় জোরপূর্বক জমি দখল, পুকুরের মাছ ধরে নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন ফলদ গাছ কেটে ফেলা, বসতবাড়ি বাঁশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার নালিতাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। তবে অভিযুক্তরা দাবি করেছেন, জমিটি তাদের ওয়ারিশি সম্পত্তি এবং বিক্রি করা জমি ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
থানায় দায়ের করা অভিযোগে বন্ধধারা গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল কাশেম ১৫ জনকে বিবাদী করেছেন। তারা হলেন—আমিনুল ইসলাম, শওকত আলী, সোহেল মিয়া, খোকন মিয়া, আপন মিয়া, আবু রায়হান, কফিল উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, মিষ্টার আলী, কমলা খাতুন, শেফালী বেগম, আলেছা বেগম, রেহেলা বেগম ও মুক্তা আক্তার।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিরোধপূর্ণ জমিটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিকানা নিয়ে বর্তমানে আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, ১৯৮৬ সালে কমলা বেগম ওই ৫০ শতাংশ জমি মরহুম আব্দুল করিমের (মেজদ্দি) কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে আব্দুল করিম জমির ২৫ শতাংশ ছারোয়ার হোসেন (তারা মিয়া) এবং বাকি ২৫ শতাংশ মৃত আব্দুল মজিদের কাছে বিক্রি করেন। পরে ছারোয়ার হোসেনও তার ক্রয়কৃত ২৫ শতাংশ জমি মৃত আব্দুল মজিদের কাছে বিক্রি করে দেন। এর ফলে পুরো ৫০ শতাংশ জমির মালিকানা মৃত আব্দুল মজিদের হাতে আসে। সেই থেকে প্রায় চার দশক ধরে তারা জমিটি ভোগদখল করে আসছেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, কমলা বেগম এককভাবে জমি বিক্রি করলেও জমিটির প্রকৃত মালিক ছিলেন নয়জন উত্তরাধিকারী। ফলে ওই বিক্রয় শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত সেখান থেকেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বিরোধ সৃষ্টি হয়। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইন, ২০২৩-এর আওতায় একটি মামলাও হয়। ওই মামলায় অভিযোগকারী পরিবারের সদস্য হাতেম আলী ও কাশেম মিয়া কিছুদিন কারাগারে ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরে স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযুক্ত পক্ষের অন্যান্য ওয়ারিশদের কাছ থেকে জমিটি ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং একপর্যায়ে একটি বায়নাপত্রও সম্পাদিত হয়। তবে পরবর্তীতে সেই সমঝোতা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, এর আগে বিরোধপূর্ণ জমিতে টিনের বেড়া দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই সময় অভিযুক্তরা জমিটির দখল নিয়েছিল। পরে সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে টিনের ঘর ও বেড়া সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে বিবাদীরা সংঘবদ্ধভাবে অভিযোগকারীর বসতবাড়ি ও বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন, গালিগালাজ এবং জোরপূর্বক জমি দখল করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বাধা দিলে তাদের মারধর করার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা প্রাণভয়ে সরে গেলে অভিযুক্তরা পুকুরের মাছ ধরে নিয়ে যান এবং জমিতে থাকা কলাগাছ, আমগাছ, পেঁপেগাছ, সুপারিগাছসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ কেটে ফেলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা অভিযোগকারী পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে বসতবাড়ির সামনের অংশ বাঁশ দিয়ে ঘিরে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
অভিযোগকারী পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাঁশের বেষ্টনী এমনভাবে দেওয়া হয়েছিল যে তাদের দুটি খড়ের গাদা এবং নলকূপে যাতায়াতও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে পরিবারের সদস্যরা পানি সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়েন।
মৃত আব্দুল মজিদের বড় ছেলে হাতেম আলী (৫৪) বলেন, “আমার বাবা বৈধভাবে জমিটি কিনেছিলেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করে আসছি। পুকুরে মাছ চাষ করেছি, গাছপালা লাগিয়েছি। আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় জোরপূর্বক জমিতে প্রবেশ করে আমাদের সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
মৃত আব্দুল মজিদের ছোট ছেলে অভিযোগকারী কাশেম আলী (৪৮) বলেন, “এই জমি নিয়ে বিবাদী পক্ষ আদালতে মামলা করেছে। মামলার জবাবও আমরা দিয়েছি। মাসখানেক আগে একবার হাজিরা দিয়েছি, আবারও হাজিরার তারিখ রয়েছে। আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি। আদালত যদি তাদের পক্ষে রায় দেয়, আমরা তা মেনে নেব। আবার আদালত যদি আমাদের পক্ষে রায় দেয়, তাদেরও তা মেনে নেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “আদালতের চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই তারা জোরপূর্বক জমি দখল করেছে, বাড়িতে হামলা করেছে, গাছপালা কেটেছে এবং বসতবাড়ি বাঁশ দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। আমি আইনের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
মৃত আব্দুল মজিদের স্ত্রী খাতেমন নেছা (৮৫) বলেন, “তারা যখন জমি দখল করতে আসে, তখন আমি বলেছি—তোমরা আদালতে মামলা করেছ, আদালতের রায় পেলে জমি নিয়ে নিও। আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু আদালতের রায় পাওয়ার আগে কেন দখল করতে আসছ? এ কথা বলার পর তারা দা-কুড়াল নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে।”
অভিযোগের বিষয়ে শওকত আলী বলেন, “আমরা ওয়ারিশ সূত্রে এই জমির মালিক। আমার ফুফু কমলা বেগম এককভাবে জমিটি বিক্রি করেছিলেন। অথচ জমিটির উত্তরাধিকারী ছিলেন চার ভাই ও পাঁচ বোন—মোট নয়জন। তাই এককভাবে তার পুরো জমি বিক্রির আইনগত অধিকার ছিল না।”
তিনি বলেন, “মৃত আব্দুল মজিদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জমিটি ভোগদখল করছে। আমরা তাদের অন্য ওয়ারিশদের কাছ থেকে জমিটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং এক লাখ টাকা বায়নায় একটি বায়নাপত্র সম্পাদিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আর জমি কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি।”
শওকত আলী আরও বলেন, “সমঝোতার আগে ওয়ারিশি দাবির ভিত্তিতে আমরা বিরোধপূর্ণ জমিতে টিনের বেড়া দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করে দখলে ছিলাম। সমঝোতার অংশ হিসেবে টিনের ঘর ও বেড়া খুলে নেওয়া হলেও আমরা সেগুলো নিয়ে আসিনি; সেগুলো এখনও তাদের কাছেই রয়েছে। পরে আমরা ওয়ারিশদের সম্মতিতে জমিটি মন্টু মিয়ার কাছে বিক্রি করি। ঘটনার দিন আমরা ক্রেতাকে জমিটি বুঝিয়ে দিতে সেখানে গিয়েছিলাম।”
গাছ কাটার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা কোনো আমগাছ, সুপারিগাছ, পেঁপেগাছ বা অন্য ফলদ গাছ কাটিনি। পুকুরের মাছও ধরিনি। শুধু কিছু কলাগাছ কাটা হয়েছে, যেগুলো আমি নিজেই লাগিয়েছিলাম।”
অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই জমি মূলত আমার মায়ের সম্পত্তি ছিল। আমার মা আমার বোন কমলা বেগমকে জমিটি ভোগ করার জন্য দিয়েছিলেন। পরে তিনি জমিটি অন্যত্র বিক্রি করে দেন। আমরা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, মায়ের কাছ থেকে লিখে নিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে জমিটি উত্তরাধিকার সূত্রে নয় ভাইবোনের সম্পত্তি।”
নালিতাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আ. হান্নান বলেন, “এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করা হয়েছে। বিষয়টি দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।”
তিনি বলেন, “আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিবাদী পক্ষকে আগে থেকেই বলা হয়েছিল, আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন সেখানে না যায়। কিন্তু তারা সেখানে গিয়েছেন। তদন্তে গাছপালা কাটার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। অভিযোগের অন্যান্য বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন বলেন, “ঘটনার সময় আমি নালিতাবাড়ীতে ছিলাম। এসআই আ. হান্নান আমাকে ফোন করেন। পরে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি বসতবাড়ির সামনের অংশ বাঁশের বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের চলাচল এবং নলকূপ ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছিল। পরে বেষ্টনীর কিছু অংশ কেটে দেওয়া হয়, যাতে তারা ওই পথ দিয়ে যাতায়াত এবং নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারেন।”
দীর্ঘদিনের এই জমি বিরোধে উভয় পক্ষই দলিল, ওয়ারিশি সূত্র, দখল এবং পূর্ববর্তী সমঝোতার বিষয় তুলে ধরে নিজেদের অবস্থানকে বৈধ দাবি করছে। ফলে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, দখল এবং সর্বশেষ ঘটনার সত্যতা এখন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও পুলিশের তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।
স্থানীয়দের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় এবং প্রশাসনের তদন্তই দীর্ঘদিনের এ বিরোধের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
