
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অতি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কৃষিসুবিধা বাড়াতে নেওয়া ১ কোটি ৮ লাখ টাকার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৪০ দিনের কর্মসূচিতে প্রতিদিন ২৫০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়ে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের মজুরি বাবদ বরাদ্দকৃত প্রায় ৫০ লাখ টাকা ভুয়া মাস্টাররোলের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
শ্রমিকের বদলে মেশিন, তালিকায় সচ্ছলদের নাম
উপজেলার কুসুম্বা ও ভারশো ইউনিয়নের ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য সরকারের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)-এর আওতায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, দুই ইউনিয়নে প্রতিদিন ১২৫ জন করে মোট ২৫০ জন অতি দরিদ্র শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার কথা। সে হিসাবে মোট ১০ হাজার শ্রমিক-দিন কাজ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্প চলাকালে খননকাজে কোনো দিনমজুরকে দেখা যায়নি। বরং চারটি এক্সকাভেটর দিয়ে খননকাজ পরিচালনা করা হয়েছে।
বাকাপুর ও কুসুম্বা এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত হতদরিদ্রদের বাদ দিয়ে শ্রমিকের তালিকায় স্থানীয় সচ্ছল ব্যবসায়ী, মুদি দোকানদার, কৃষক ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্য উপজেলায় লাখ লাখ টাকা ফেরত, মান্দায় মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় খাল পুনঃখনন প্রকল্প শেষে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলায় ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বদলগাছীতে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পোরশায় ১২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, মান্দা উপজেলায় ১০ হাজার শ্রমিক-দিনের মধ্যে মাত্র ৬১ জন শ্রমিক অনুপস্থিত দেখিয়ে ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে এত বড় প্রকল্পে প্রায় শতভাগ শ্রমিক উপস্থিত দেখানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও প্রকল্পে ‘ঐক্য’র অভিযোগ
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন ভারশো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান।
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা দুই জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে প্রকল্পের কাজে অনিয়ম হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে খাল খননের অভিযোগ
শুধু শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিন ব্যবহার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগই নয়, প্রকল্পের খননকাজ নিয়ে কৃষকদের জমি ব্যবহারের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।
কামারপুর ও ভারশো গ্রামের প্রীতি রানী, মোখলেসুর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, জমি অধিগ্রহণ বা যথাযথ অনুমতি ছাড়াই তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমির ওপর দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ করেও তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন।
নকশা অনুযায়ী খনন না হওয়ায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী খালের গভীরতা ১০ ফুট, তলদেশের প্রস্থ ১২ ফুট এবং ওপরের প্রস্থ ৩০ ফুট থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক স্থানে খালের তলদেশ ও আশপাশের ফসলি জমির উচ্চতা প্রায় সমান রাখা হয়েছে।
এতে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের দাবি, সঠিকভাবে খনন না হলে খাল পুনঃখননের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে এবং হাজার হাজার বিঘা জমিতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও পিআইওর
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও কুসুম্বা ইউপি চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, খননকাজে চারটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হলেও ২৫০ জন শ্রমিকের উপস্থিতি সঠিক ছিল। তবে ভুলবশত দু-একজন সচ্ছল ব্যক্তির নাম শ্রমিকের তালিকায় থাকতে পারে বলেও তিনি জানান।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফুল ইসলামও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, মান্দা উপজেলাতেই শতভাগ অতি দরিদ্র শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলো কাজ সম্পন্ন করতে না পারায় হয়তো তাদের বরাদ্দের অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি এবং উপজেলা পিআইওর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
খাল পুনঃখনন প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিন ব্যবহার, শ্রমিকের তালিকায় সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তি, বরাদ্দের অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করা এবং কৃষকদের জমি ব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের দাবি, অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকল্পের বরাদ্দ, মাস্টাররোল, শ্রমিকের উপস্থিতি, খননকাজের পরিমাপ ও ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হোক। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
