
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের সমশূড়া গ্রামে দুই তরুণকে আটকে মারধর ও টাকা নেওয়ার অভিযোগে নাম আসা চান মিয়া, ইউনুছ আলী ও মাহফুজ কেউই ইউনিয়নের চারটি মাদক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য নন বলে দাবি করেছেন কমিটির সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, কমিটির সদস্য না হয়েও ওই ব্যক্তিরা ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র পরিচয় ব্যবহার করেছেন। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পোড়াগাঁও ইউনিয়নের চারটি মাদক প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা বুরুঙ্গা-কালাপানি মাদক প্রতিরোধ কমিটির কার্যালয়ে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানান। কমিটিগুলো হলো—বাতকুচি-বেকিকুড়া মাদক প্রতিরোধ কমিটি, বুরুঙ্গা-কালাপানি মাদক প্রতিরোধ কমিটি, মধুটিলা ইকোপার্ক মাদক প্রতিরোধ কমিটি এবং ধোপাকুড়া বাজার মাদক প্রতিরোধ কমিটি।
কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, তাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা। কাউকে আটকে রাখা, মারধর করা, টাকা নেওয়া বা ভয়ভীতি দেখানো তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ নয়।
গত ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে সমশূড়া বাজার থেকে ধোপাকুড়া বাজারে যাওয়ার পথে স্থানীয় ময়দালীর বাড়ির কাছে জাহিদ ও আশিক ইসলাম নামের দুই তরুণকে থামানোর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন নিজেদের ‘মাদক নির্মূল কমিটির’ সদস্য পরিচয় দিয়ে তাদের বহনকারী অটোরিকশায় তল্লাশি চালান। তল্লাশিতে কোনো মাদক পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এরপর তাদের মারধর করে টাকা নেওয়া হয় এবং ছেড়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ৭ সেপ্টেম্বর নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন সমশূড়া গ্রামের গারো সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা। অভিযোগে চান মিয়া, ইউনুছ আলী ও মাহফুজের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫–১৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। পুলিশ অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাতকুচি-বেকিকুড়া মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, চান মিয়া, ইউনুছ আলী ও মাহফুজ তাঁদের কমিটির সদস্য নন। কমিটির সদস্যদের তালিকায় তাদের নাম নেই। তার মতে, মাদকবিরোধী কমিটির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ এমন ঘটনায় জড়ালে সেটি সংগঠনের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বুরুঙ্গা-কালাপানি মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম এসেছে, তাদের সঙ্গে তাদের কমিটির কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই। মাদক প্রতিরোধের নামে কাউকে হয়রানি বা মারধর করার ঘটনা তারা সমর্থন করেন না। প্রশাসনের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মধুটিলা ইকোপার্ক মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আনসার আলী বলেন, ঘটনাটি ধোপাকুড়া এলাকার হওয়ায় তাদের কমিটির নামও এ ঘটনায় আলোচনায় আসতে পারে। তবে অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিরা তাদের কমিটির সদস্য নন। কমিটির নাম বা পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কোনো অনিয়ম করলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঘটনার সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান তিনি।
বাতকুচি-বেকিকুড়া মাদক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য জহিরুল ইসলাম বলেন, চান মিয়া, ইউনুছ আলী ও মাহফুজ তাদের কমিটির কেউ নন। মাদক প্রতিরোধের সামাজিক উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কমিটির সদস্যদের সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বুরুঙ্গা-কালাপানি মাদক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য জাফর ইকবাল বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কেউ তাদের কমিটির সদস্য নন। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে মাদক প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, সদস্যদের পরিচয়পত্র থাকলে কমিটির বাইরের কেউ নিজেকে ওই কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে কমিটির নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো অনিয়ম করলে প্রকৃত সদস্যদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না।
চার কমিটির সদস্যরা বলেন, তারা মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চান। তবে কমিটির পরিচয় ব্যবহার করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই নিতে হবে। এ ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
