
শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে কাঠ ব্যবসার কথা বলে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং মোটরসাইকেল, আইফোন, স্মার্টওয়াচ ও নগদ ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় আদালতে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন অভিযোগকারী জান্নাতুল নাঈম। তার দাবি, আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী সদর বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন জান্নাতুল নাঈম। তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পাড়া পাচাশী গ্রামের নুরুল হকের ছেলে।
লিখিত বক্তব্যে জান্নাতুল নাঈম বলেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর কাঠ বিক্রির কথা বলে তাকে নালিতাবাড়ী আড়াইআনি বাজারের কালেমা চত্বরে ডেকে নেন মিজানুর রহমান মিজান। পরে তাকে স্থানীয় একটি কফি হাউসে নিয়ে কফি পান করানো হয়। সেখান থেকে কাঠ দেখানোর কথা বলে কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি সাত্তারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
জান্নাতুল নাঈমের অভিযোগ, ওই বাড়ির একটি ঘরে মিজানসহ আরও চার-পাঁচজন তাকে আটকে রেখে মারধর করেন। এ সময় তার মুঠোফোন ও মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেওয়া হয়। মারধরে তার কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নির্যাতনের মুখে তার মুঠোফোনের পাসওয়ার্ড দিতে বাধ্য হন। এরপর ফোনে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। পাশাপাশি তার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের নেক্সাসপে অ্যাপের পাসওয়ার্ডও চাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জান্নাতুল নাঈমের দাবি, তার মানিব্যাগে থাকা এটিএম ডেবিট কার্ড, মায়ের ছবি, মোটরসাইকেলের স্মার্টকার্ড ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং ব্যাগে থাকা নগদ দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। পরে এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাপানপ্রবাসী ‘Angel Moon’ নামের একটি ফেসবুক আইডির ব্যবহারকারী লিমা সাহার কাছ থেকে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে তাকে আটকে রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জান্নাতুল নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে রিপন নামের এক ব্যক্তি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন। ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর না করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। প্রাণভয়ে আট থেকে নয়টি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন বলেও জানান।
তিনি আরও দাবি করেন, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। পরে অন্য একটি মোটরসাইকেলে করে হালুয়াঘাট বাজারের বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে তাকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সেখান থেকে এক চায়ের দোকানির ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরে চিকিৎসা নেন বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে শেরপুরের আদালতে সিআর মামলা নম্বর ৮০৬/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে জানান জান্নাতুল নাঈম। তার দাবি, আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মিজানুর রহমান মিজানও একই আদালতে জান্নাতুল নাঈমের বিরুদ্ধে সিআর মামলা নম্বর ৮৩৪/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। মিজান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে আর্থিক লেনদেনের বিরোধ ও পরিকল্পিত মামলা বলে দাবি করেছেন। গত ১৩ অক্টোবর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিজান ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেছেন বলে উল্লেখ করেন জান্নাতুল নাঈম।
সংবাদ সম্মেলনে জান্নাতুল নাঈম মামলাটির নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযোগে উল্লিখিত মালামাল উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানান। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জান্নাতুল নাঈমের পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
