নিজস্ব প্রতিবেদক
আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার পরও থামেনি ফরহাদ হোসেনের দখলদারিত্ব। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মালিঝিকান্দা গ্রামে মৃত গিয়াস উদ্দিনের সাবকৌলা দলিলভুক্ত জমি নিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছে, আদালতের রায় অনুযায়ী জমি বুঝে পেলেও ফরহাদ হোসেন নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাদের আতঙ্কের মধ্যে রেখেছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, ফরহাদ হোসেন মৃত সেকান্দর আলীর বড় ছেলে। তিনি ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। প্রায় প্রতি বছর গ্রামে এসে তিনি পিতার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে জমি বিক্রি করতে করতে প্রায় নিঃস্ব হয়ে এখন তিনি অন্যের জমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মৃত গিয়াস উদ্দিনের সাবকৌলা দলিলভুক্ত সম্পত্তি দীর্ঘদিন যাবত জোরপূর্বক ভোগদখল করে আসছেন ফরহাদ হোসেন। গিয়াস উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী বিলকিস বেগম ওই জমি ভোগের উদ্যোগ নিলে ফরহাদ দলিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে বিলকিস বেগম আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তার পক্ষে ডিগ্রি ও রায় প্রদান করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় আমিনের মাধ্যমে আদালতে রায়কৃত জমিটি বুঝে নেন বিলকিস বেগম।
ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করে বলেন, আদালতের রায় কার্যকর হওয়ার পর জমি চাষাবাদ ও আবাদ করতে গেলে ফরহাদ হোসেন ও তার সহযোগীরা শ্রমিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং জীবননাশের হুমকি দেন। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হলে আর কোনো শ্রমিক ওই জমিতে কাজ করতে রাজি হননি।
নিরুপায় হয়ে শনিবার (৯ আগস্ট) বিলকিস বেগম তার ছোট ছেলে জান্নাতুল বাকি ও দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে নিজেরাই জমিতে ধান রোপণ করেন। ফরহাদ হোসেন বিলকিস বেগম ও তার সন্তানদের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা ধান রোপণের সময় পুরো ঘটনাটি এন্ড্রয়েড ফোনে ভিডিওর মাধ্যমে ধারণ করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ধান রোপণের সময় রাস্তার পাশে ও আশেপাশের বাড়ি-ঘরের লোকসহ শত শত মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন; সেখানে কোনো আপত্তিকর ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে জমিটি বিলকিস বেগমের দখলে রয়েছে।
এদিকে, ফরহাদ হোসেন থানায় একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি মৃত গিয়াস উদ্দিনের পরিবারকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, থানায় মামলা করেছি, পুলিশকে পাঁচ হাজারের জায়গায় বিশ হাজার দেব, তবুও তোদের দেখে নেব। এখনো সময় আছে জমি ছেড়ে দে, নইলে জেলের ভাত খাওয়াবো।
এছাড়া ফরহাদ হোসেন স্থানীয় একজন সংবাদকর্মী মো. আবু হেলালকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ‘বাংলা Press মিডিয়া’ নামক একটি অনলাইন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিক আবু হেলাল বলেন, ফরহাদ হোসেন মৃত গিয়াস উদ্দিনের জমির সাবকৌলা দলিল ও আদালতের ডিগ্রির বিষয়টি গোপন করেছে। আমি কেবল তার দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই সংবাদ করেছি। যদি আদালতের রায়ের বিষয়টি জানতাম, তাহলে কখনোই এমন সংবাদ প্রকাশ হতো না।
এ অবস্থায় শুক্রবার (১৫ আগস্ট) বিলকিস বেগম বাদী হয়ে ঝিনাইগাতী থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কামারপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মুক্তার হোসেন বলেন, ফরহাদ জমিতে ধান রোপণ করতে যাওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে, ফলে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই জমিতে আর কোনো শ্রমিক ধান রোপণ করতে রাজি হননি। নিরুপায় হয়ে বিলকিস বেগম তার দুই মেয়ে এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে ধান রোপণ করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। মেয়েরা ধান রোপণ করার সময় রাস্তার পাশে দাঁড়ানো শতশত উৎসুক জনতা তাদের দেখেছে। ফরহাদ হোসেন থানায় অভিযোগ করেছেন যে বিলকিস বেগম ও তার মেয়েরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জমিতে গিয়েছেন এবং তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন ও আহত করেছেন; তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট।
প্রত্যক্ষদর্শী মালিঝিকান্দা গ্রামের ওই জমির সংলগ্ন বাড়ির বাসিন্দা মো. কালু মিয়া বলেন, বিলকিস বেগম তার দুই মেয়ে ও ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যখন ধান রোপণ করছিলেন, তখন আমি এবং আশেপাশের বাড়ির লোকজন, রাস্তা দিয়ে যাওয়া অটোরিক্সা ও মোটরসাইকেলের যাত্রীসহ শত শত মানুষ তা দেখেছে। সেখানে কোনো আপত্তিকর ঘটনা ঘটেনি। ফরহাদ হোসেনের থানায় দেওয়া অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট।
ভুক্তভোগী মৃত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, আমার স্বামী নেই। আমি আমার দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি; তারা জামাইয়ের বাড়িতে থাকে। বাড়িতে বর্তমানে আমি এবং আমার ছোট ছেলে আছি। ফরহাদ আমাকে এবং আমার সন্তানদের জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে। আদালতের রায় পাওয়ার পরও আমি এই জমি সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলা করতে পারছি না। আমি ঝিনাইগাতী থানায় একটি অভিযোগ করেছি এবং এর সুষ্ঠু সমাধান চাই। ফরহাদের অত্যাচার থেকে আমি এবং আমার পরিবার বাঁচতে চাই।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অনেক রাতে ঘুমাতে গিয়েছি, এখনো বাসায় আছি। আমার কাছে অনেক অভিযোগ রয়েছে। অফিসে গিয়ে না দেখে এ বিষয়ে সঠিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। অফিসে গিয়ে অভিযোগের বর্তমান অবস্থা জানাতে পারব।