তাওহিদুজ্জামান রোমান
শেরপুর জেলা প্রতিনিধি | জনগণের কন্ঠ
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা নিয়ে রহস্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে অন্য নম্বরে টাকা উত্তোলনের অভিযোগে তোলপাড় শুরু হলেও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ঘটনায় সরাসরি ইউনিয়ন সচিবকে দায়ী করার মতো সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
উপজেলার মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের হাসলীগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বপ্না আক্তারের বাবা মো. সহিজ উদ্দিন, যিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ও হতদরিদ্র, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির আইডি নম্বর ৯১ এবং প্রকৃত মোবাইল নম্বর ছিল ০১৯০৪৯৩৪১২৬। কিন্তু সচিব মো.খোরশেদ আলম বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগসাজশে তার ব্যক্তিগত নম্বর ০১৯১২-৪০১১৮৭ ব্যবহার করে নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা তুলে নেন।
শিক্ষার্থীর বাবা মো. সহিজ উদ্দিন বলেন, আমার এক ছেলে এবং এক মেয়ে আছে। ছেলে মোঃ আব্দুল্লাহ, যিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে, আর মেয়ের নাম স্বপ্না, তিনি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। আমি ভেবেছিলাম, আমার ছেলে-মেয়ের কেউ উপবৃত্তি পাননি, তাই বিদ্যালয়ে খোঁজ খবর রাখিনি। তবে তিন মাস আগে জানতে পারি, আমার ছেলে-মেয়ের দুজনেরই উপবৃত্তি হয়েছে। ছেলের টাকা আমার নম্বরে আসছিল এবং আমি সেটি উত্তোলন করেছি। কিন্তু মেয়ের টাকা অন্য একটি ভুল নাম্বারে চলে গেছে। আমি দরিদ্র মানুষ, আমার জন্য এই টাকাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই, আমার মেয়ের প্রাপ্য উপবৃত্তি ফেরত দেওয়া হোক এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা রূপালী বেগম বলেন, আমি পুরোনো ফাইল থেকে শিক্ষার্থীর জন্ম নিবন্ধন বের করেছি। জন্ম নিবন্ধনের বিপরীতে যে নম্বরটি লেখা ছিল, সেটিই সিস্টেমে যুক্ত করা হয়েছে। ওই নম্বর থেকেই টাকা উত্তোলন হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষিকা মোখলেছা বেগম, যিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অবসরে গেছেন, তিনি বলেন— সচিব খোরশেদ আলমের সাথে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, তার সাথে আমার কোনো যোগাযোগও নেই, আমি তাকে চিনিও না। স্বপ্নার উপবৃত্তি চালু হওয়ার সময় আমরা জন্ম নিবন্ধন সংগ্রহ করেছিলাম। জন্ম নিবন্ধনের বিপরীত পৃষ্ঠায় শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে যে নাম্বারটি লেখা হয়েছিল, আমরা সেটিই ব্যবহার করেছি। পরবর্তীতে অনেক শিক্ষার্থীর সমস্যা হলে অভিভাবকরা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করেছি। একটি বিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষার্থী থাকে, প্রতিটি নম্বর আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে স্বপ্না বা তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি। বর্তমানে অভিযোগ করায় বিষয়টি সামনে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে মালিঝিকান্দা ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন সচিব (বর্তমানে নালিতাবাড়ীর নন্নী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা) মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমি মোবাইল ও নগদ বিষয়ে তেমন কিছু বুঝি না। আমার নামে যে নগদ একাউন্ট খোলা আছে, সেটি কীভাবে হয়েছে বা কে টাকা তুলেছে, আমি জানি না। আমার ব্যক্তিগতভাবে টাকা তোলার কোনো প্রমাণও নেই।
শেরপুর জেলা নগদ তথ্য অফিস থেকে পাওয়া স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা যেসব নম্বরে ক্যাশ আউট হয়েছে, তার বেশিরভাগই বর্তমানে আইকন অ্যাপে ‘হ্যাকার’ ও ‘ভুয়া’ নম্বর হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। তবে সর্বশেষ একটি নাম্বার নন্নী বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম নামে নিবন্ধিত বলে শনাক্ত হয়েছে।
নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার ববি লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।