
নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার কোলা গ্রামের কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট আলেম, ধর্মপ্রচারক, লেখক ও যুক্তিবাদী সুবক্তা মাওলানা দেওয়ান ইব্রাহিম হোসেন তর্কবাগীশ ছিলেন উত্তরবঙ্গের ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় প্রচার-প্রসারে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজস্ব যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, প্রাঞ্জল ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানসমৃদ্ধ রচনার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সময়ে অত্র অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি স্নেহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘মাওলানা সাহেব তর্কবাগীশ’ নামে পরিচিত ছিলেন।
মাওলানা ইব্রাহিম হোসেন তর্কবাগীশ পহেলা বৈশাখ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ (১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ) বদলগাছী উপজেলার কোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ মাওলানা দেওয়ান মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম, সুসাহিত্যিক, পণ্ডিত ও উত্তরবঙ্গের ইসলামী ধর্মপ্রচারে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি। পারিবারিকভাবে অর্জিত জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় পরিবেশ তাঁর জীবনদর্শন ও কর্মজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ১৯৪২ সালে সোনামুখী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তবে গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। পরবর্তীতে তাঁর কর্মজীবনে বৈচিত্র্য দেখা যায়। ১৯৪২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন এবং যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে গোপালপুর চিনিকলে সিডিআই পদে কিছুদিন চাকরি করেন। জীবনের প্রথম দিকে তিনি কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ঘোড়ায় চড়ে আশপাশের বিভিন্ন হাটে কাপড় বিক্রি করতে যেতেন। সাধারণ মানুষের জীবন ও সমাজের সঙ্গে তাঁর এই প্রত্যক্ষ যোগাযোগ পরবর্তী সময়ে তাঁর চিন্তা, বক্তব্য ও লেখনীকে আরও সমৃদ্ধ করে।
পরবর্তী জীবনে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, ওয়াজ-মাহফিল এবং লেখালেখিতে নিয়োজিত করেন। যুক্তিনির্ভর ও প্রাঞ্জল বক্তব্যের জন্য তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় একজন জনপ্রিয় ওয়ায়েজ ও সুবক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি যুক্তি, ইতিহাস, সমাজ ও সমকালীন বাস্তবতার সমন্বয় দেখা যেত। ফলে সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে জ্ঞানপিপাসু মানুষের কাছেও তাঁর বক্তব্য বিশেষ আকর্ষণীয় ছিল।
মাওলানা তর্কবাগীশ বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজজীবন বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
- কোরআন বিজ্ঞান দর্শন;
- মহাশূন্যের রহস্যসন্ধানে আধুনিক বিজ্ঞান ও কোরআন-হাদিস;
- চার তরিকায় অজিফায়ে সিদ্দিকীয়া;
- নারী বাড়ির রানী;
- উত্তর বাংলার আউলিয়া প্রসঙ্গ- প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডসহ অন্যান্য গ্রন্থ।
- তাঁর রচিত ‘উত্তর বাংলার আউলিয়া প্রসঙ্গ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উত্তরবঙ্গের ধর্মীয় ঐতিহ্য, আউলিয়া-দরবেশ ও ইসলামী সংস্কৃতির নানা দিক সংরক্ষণে এটি একটি মূল্যবান সংকলন হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর লেখার ভাষা ছিল মার্জিত, সাবলীল ও সাধারণ পাঠকের বোধগম্য। ধর্মীয় বিষয়কে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তাঁর স্বতন্ত্র দক্ষতা ছিল।
মাওলানা দেওয়ান ইব্রাহিম হোসেন তর্কবাগীশ শুধু একজন ধর্মীয় বক্তা বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন নিজ এলাকার মানুষের জন্য জ্ঞান, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্ম ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বদলগাছী তথা নওগাঁর একটি বিশেষ সময়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রতিফলিত হয়।
জীবনের শেষভাগে তিনি পক্ষাঘাতজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ২২ মে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ৬৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে উত্তরবঙ্গের ধর্মীয় অঙ্গনে এবং নিজ এলাকায় অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
প্রিয় বন্ধু ইয়াকুব আলী মিলুর বাবা হিসেবে মাওলানার পারিবারিক ও সামাজিক পরিচয়ের একটি আবেগঘন সম্পর্ক ও অনুভূতি আমাদের মাঝে কাজ করে। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন কোলা ও বদলগাছী এলাকার গর্ব, যাঁর জ্ঞানচর্চা, ধর্মপ্রচার, লেখনী ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও স্মরণযোগ্য। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে জ্ঞান, সততা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মহান আল্লাহ তাআলা মাওলানা দেওয়ান ইব্রাহিম হোসেন তর্কবাগীশের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
